ভারতের আসাম রাজ্যে বসবাসরত মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতেই সংশোধিত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশিত হয়েছে। এমনটাই মন্তব্য করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। শনিবার (৩১ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকালে প্রকাশিত তালিকাটি থেকে ১৯ লাখের বেশি লোককে বাদ দেওয়ায় এক টুইট বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
পাক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রধানত ভারতে মুসলিম নিধনের উদ্দেশ্যেই মোদী সরকার আসামের নাগরিক তালিকাটি করেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি যেভাবে মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং সেই খবর ভারতসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যেমন করে প্রকাশিত হচ্ছে, তা গোটা দুনিয়ার কাছেই এক অশনি সংকেত।’
ইমরান খান বলেন, ‘ভারত সরকার এই একই উদ্দেশে মুসলমানদের নিজেদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে কাশ্মীরেও এক অবৈধ দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। বর্তমানে যার বিরুদ্ধে গোটা দুনিয়া সোচ্চার, মোদী সরকার খব শিগগিরই এসবের জন্য ফল ভোগ করবে।’
মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নাগরিক তালিকাটি প্রকাশ করেছে। যা মূলত মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দরিদ্র আসাম রাজ্যে অভিবাসীদের চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে।
এবার যেসব বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হলো তাদের অনেকেরই জন্ম ভারতে; এমনকি তারা এতদিন সকল নির্বাচনের ভোটসহ সব ধরনের অধিকার ভোগ করে আসছিলেন। যদিও সদ্য প্রকাশিত এই তালিকাটির মাধ্যমে অসংখ্য লোক এই এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
গণমাধ্যমটির দাবি, শনিবার প্রকাশিত আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকার (এনআরসি) মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে অন্তত ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ বাঙালিকে। যেখানে আগের তালিকায় বাদ দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দাকে। তাছাড়া স্বীকৃতি মিলেছে প্রায় ৯ কোটি ১১ লাখ লোকের। যদিও এই তালিকা থেকে বাদ পড়াদের নিয়ে এবার আসাম তো বটেই, গোটা ভারত এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ পর্যন্ত মোদী সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
এরই মধ্যে আসামের অর্থমন্ত্রী ও রাজ্যের বিজেপি নেতা হিমন্তবিশ্ব শর্মা স্থানীয় ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। যেখানে বিজেপি এই এনআরসির রিপোর্টকে মানবে না বলে তিনি জানিয়েছেন। হিমন্ত বাবু বলেন, ‘আমাদের এই নাগরিক তালিকাটি মোটেও বিদেশি বিতাড়নের অস্ত্র নয়। মূলত আসামকে বিদেশিমুক্ত করতে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার এই নতুন পথে হেঁটেছে।’
এ দিকে বিশ্লেষকদের মতে, আসামের এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়াদের কাছে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকত্ব নেই; এমনকি ভারত ছাড়া আর কোনো দেশেরই নাগরিকত্ব নেই তাদের। এমন অবস্থায় ভারত তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে মানুষগুলো একদমই রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে; যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ।
যে কারণে ভারত অনেকটা বাধ্য হয়েই তালিকা থেকে ছিটকে যাওয়াদের নিজ দেশের ভেতরেই বন্দি বানিয়ে রাখবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যার অংশ হিসেবে আসামে এরই মধ্যে নতুন করে ১০টি বন্দি শিবির নির্মাণের কাজ শুরু করেছে রাজ্য সরকার। তাছাড়া অঞ্চলটিতে অতিরিক্ত ১৭ হাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও মোতায়েন করা হয়েছে।
অপর দিকে তালিকায় নাম না-থাকাদের এখনই তাড়িয়ে দেওয়া হবে না বলে কর্মকর্তারা বারংবার আশ্বস্ত করলেও; এর মাধ্যমে রাজ্যের সংখ্যালঘু বাঙালি বিশেষত মুসলমান জনগণকে ‘উইচ হান্টিং’ শিকার হতে হবে বলে আশঙ্কা পর্যবেক্ষকদের।
যদিও সংশোধিত এই তালিকা থেকে বাদ পড়া আবেদনকারীরা তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন বলে অনেক আগেই জানিয়েছেন রেজিস্টার জেনারেল অব ইন্ডিয়া শৈলেশ।
তিনি বলেছিলেন, ‘এনআরসির প্রতিবেদনের ফলাফলকে আপত্তি জানানোর জন্য বাসিন্দারা পর্যাপ্ত সময় এবং যথেষ্ট সুযোগ পাবেন। মূলত এর পরই সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তালিকায় নাম না থাকা মানেই তারা বিদেশি নন। যে সমস্ত অধিবাসীদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে না তাদের বিদেশ ট্রাইব্যুনালে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ পাবেন। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ৬০ দিন থেকে করা হয়েছে ১২০ দিন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই এক হাজারটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এখানে নাম নথিভুক্ত না হলে সেই ব্যক্তি দ্বারস্থ হতে পারেন হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই তালিকাভুক্ত না হওয়া ব্যক্তিকে শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হবে না। একই সঙ্গে আরও জানানো হয়েছে, জেলাস্তর থেকে আইনি সাহায্য পাবেন এই সমস্ত ব্যক্তিরা।