
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ প্রশ্নে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম মহা নগরের হালিশহর বড়পোল মোড়ে স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য ‘বজ্রকণ্ঠ’ ।
এদিকে, ঢাকার প্রবেশ দ্বার ধোলাইপাড় চত্বরে বঙ্গবন্ধুর আর একটি ভাস্কর্য স্থাপনের প্রশ্নে বিরোধিতা শুরু করে ইসলামপন্থি বিভিন্ন সংগঠন। এখানে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের পরিবর্তে আল্লাহর ৯৯ নাম খচিত স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন আলেমসমাজ। এ দাবিতে গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-ধোলাইপাড় চত্বরে গণজমায়েত করেছে বাংলাদেশ ইমাম মুসল্লি ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন।
গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলার মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্যপরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী বৃহস্পতিবার (২৬ নভেম্বর) জামেয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসায় আলেমদের এক জরুরি সভায় প্রাণী বা মানবমূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
ওদিকে, চরমোনাইয়ের পীর ও ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম ভাস্কর্য নির্মাণের স্থল ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকায় এক সমাবেশে বলেন, “ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের চক্রান্ত তৌহিদি জনতা রুখে দেবে। রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে মূর্তি স্থাপনের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে। সরে না এলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।” একই দিনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক ঢাকার এক অনুষ্ঠানে বলেন, “বঙ্গবন্ধুর মূর্তি স্থাপন, তার আত্মার সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করে, তারা বঙ্গবন্ধুর সুসন্তান হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন মুসলিম হিসেবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার মূর্তি তৈরি করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হলে তা হবে বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে বেইমানি।”
শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী পার্বতী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক মাহফিলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, কোনো ভাস্কর্য তৈরি হলে তা টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়া হবে।
নতুন ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য:
এদিকে নতুন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দায়িত্ব গ্রহনের পর রবিবার (২৯ নভেম্বর) প্রথম অফিসে এসে এ প্রসংগে সাংবাদিকদের কাছে তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিশ্বের সব দেশেই ভাস্কর্য আছে, মূর্তি আর ভাস্বর্য এক নয়। সার্বিক দিক থেকে এ সমগ্র বিষয় চিন্তায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই আমি চেষ্টা করব। সবার কাছে আন্তরিক সহযোগিতা চাই।’ তিনি বলেন, ‘ভাস্কর্যই যদি মূর্তি হয় তবে টাকার ভেতরে বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে। এর আগে যারা ছিলেন তাদের ছবি ছিল। সেগুলো কীভাবে থাকল। সেগুলো সবাই পকেটে নিয়ে ঘোরে, কয়েনের মধ্যেও আছে। সারাবিশ্বে সব জায়গায় যান, কয়েনের ভেতরে সবকিছু আছে।’
স্বেচ্ছাসেবক লীগের মানববন্ধন:
বঙ্গন্ধুর ভাষ্কর্য স্থাপনের বিরোধীতাকারিদের “স্বাধীনতা বিরোধী” আখ্যা দিয়ে আওয়ামীলিগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ গতকাল (রবিবার) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক মানববন্ধন কর্মসূচি আয়োজন করে। মানববন্ধনে নেতৃবৃন্দ হুৃঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, সাম্প্রতিক মৌলবাদ অপশক্তি কে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে প্রতিরোধ করা হবে।
মাওলানা মামুনুল হকের ব্যাখ্যা:
ওদিকে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতার ব্যাখ্যা দিয়ে হেফাজতে ইসলামের নবনিযুক্ত যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক গতকাল (রোববার ) রাজধানীর পুরনা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আমাদের বক্তব্য ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে, কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নয়।”
তার বক্তব্য নিয়ে অপপ্রচার হচ্ছে মন্তব্য করে এই হেফাজত নেতা বলেন, “স্বাধীনতার মহান নেতা ও স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুসলিম নেতা হিসেবে আমি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা করি এবং তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি। কখনো কোনোভাবেই এমন একজন মরহুম জাতীয় নেতার বিরুদ্ধাচরণ করি না এবং করাকে সমীচীন মনে করি না।” গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলার মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্যপরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়। খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আমির ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আজিজুল হকের পুত্র মামুনুল বলেন, “অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমার বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে৷ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনকে আমার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হচ্ছে৷”
ওবায়দুল কাদের:
ওদিকে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক-সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শনিবার নিজ সরকারি বাসভবনে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে
বলেছেন , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অনাহূত বিতর্কের সৃষ্টি করছে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের সংস্কৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মপ্রিয় মানুষের মনে বিদ্বেষ ছড়ানোর অপচেষ্টা করছে।’
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘সরকারের সরলতাকে দুর্বলতা ভাববেন না, জনগণের শান্তি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা জনগণই রুখে দাঁড়াবে। দেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো বক্তব্য বরদাশত করা হবে না।’
রাশেদ খান মেনন:
সাম্প্রতিক কালে ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজত এবং জামাতিদের বক্তব্য শুধুমাত্র ভাস্কর্যের বিরোধিতা হিসেবে দেখলে চলবে না, তাদের এই বিরোধিতা মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন রাশেদ খান মেনন এমপি।
তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতাদের মৃত্যুদণ্ড এবং শাস্তির বিষয়টি ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর অবলম্বনই খুঁজেছে।
মেনন বলেন,ধর্মবাদী রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতা করলে পরিণতি যে শুভ হয় না, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ফেলে ভেঙে ফেলার হুমকি তার প্রমাণ। ওয়ার্কার্স পার্টিসহ সকল অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে স্বাধীনতা বিরোধী এই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
এ প্রসংগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম শনিবার গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেন, ভাস্কর্য বা মূর্তির বিরোধিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধিতা নয়। এটা যারা বুঝতে পারে না, তারাই দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।
মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, দেশের শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ ও চট্টগামে ছাত্রলীগ, যুবলীগকে মাঠে নামিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করিয়ে সরকার অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মুফতি ফয়জুল করীম আরও বলেন, ওলামায়ে কেরাম শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যবিরোধী নন, তারা সব মানবমূর্তি বা ভাস্কর্যের বিরোধী। ওলামায়ে কেরাম বঙ্গবন্ধুসহ দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণ চান বলেই তার বিরোধিতা করছেন এবং ওলামায়ে কেরাম মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিষয়ে খোলামেলা বিশ্লেষণ করে জাতিকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন।















