পাচার করা অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে আসা অসাংবিধানিক: টিআইবি

0
400

দেশ থেকে বিদেশে পাচার করা অর্থ রেমিট্যান্স ফেরত আনার ঢালাও সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের যুক্তিতে এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাচারকারীরাও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের মতোই আড়াই ভাগ হারে প্রণোদনা পাবেন। একই সঙ্গে পাচার করা অর্থ ফেরাতে আসছে বাজেটে স্বল্প জরিমানা দিয়ে বিদেশে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ঘোষণা বা ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ দেওয়ার আভাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ ধরনের সুযোগ প্রদান শুধু অনৈতিক ও সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতই নয় বরং অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি এসব কথা বলেছে। বিবৃতিতে অনৈতিক ও আইন পরিপন্থী এসব সুযোগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। সেই সঙ্গে বিদ্যমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থপাচার প্রতিরোধ ও পাচারকারীদের চিহ্নিত করে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছে।

টিআইবি বলছে, নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় পাচারকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার যে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, বাস্তবে তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গর্হিত এই অপরাধের জন্য শাস্তির বদলে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করার এসব উদ্যোগকে অর্থ পাচারকারী তথা দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার শামিল।।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের অর্থপাচার রোধে প্রণীত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।’

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে এভাবে রাজক্ষমার ঘোষণার প্রেক্ষিতে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে চলমান মামলাসমূহের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘অর্থপাচারের মামলায় অভিযুক্তরাও এ সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলে তাদের কি কোনো শাস্তি ভোগ করতে হবে না? এ ক্ষেত্রে সরকার কি তবে আইনের শাসনের পথ ফেলে আপসের পথে হাঁটবে? এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা জরুরি। বাজেটে বারবার কালো টাকা সাদা করার অন্যায্য, অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতি সহায়ক সুযোগ দেওয়া হলেও তাতে রাষ্ট্রের কোন উল্লেখযোগ্য সুফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার বিব্রতকর উদহারণের পরও পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর নামে এ ধরনের অনৈতিকতার মহোৎসব কোন বাস্তব ফল বয়ে আনবে মনে করাটা অযৌক্তিক এবং সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে “শূন্য সহনশীলতা” নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে পাচারকারীরা অর্থ পাচারে বরং আরও উৎসাহিত হবে, অর্থ পাচার আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’

গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালেই আট বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করেছে তার উল্লেখ করে নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘অর্থ পাচারের এই তথ্য সরকারের অজানা নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, দায়িত্বে অবহেলা, সৎসাহসের ঘাটতি এবং এমনকি যোগসাজশের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অর্থ পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে পাচার হওয়া অর্থ যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তার প্রমাণ হিসেবে সরকারি উদ্যোগে সিঙ্গাপুর থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হয়েছিল।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘আইন প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট ও পরীক্ষিত পথ পরিহার করে অর্থ পাচারকারীদের অনৈতিক সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করা যাবে না। এত দিনে এটি স্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের পেশাগত উৎকর্ষ ও সৎসাহসের পাশাপাশি সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া অর্থ পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। অর্থ পাচার রোধে তাই দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।’

টিআইবি মনে করে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের যে তথ্য জিএফআই এর মত আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রকাশ করে, সেটি আংশিক। তারা শুধু বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের তথ্য দেয়। বাস্তবে এ অপরাধের প্রক্রিয়া ও গভীরতা আরও অনেক বেশি। তাই অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অন্যতম রাষ্ট্রীয় প্রাধান্য। এ জন্য সরকারের উচিত, অর্থ পাচারকারীদের জন্য অভিনব সুযোগ বা সুরক্ষা প্রদানের পথ পরিহার করে অবিলম্বে অর্থ পাচারকারীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

আপনার মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here