
আমিরুন্নেছা বিনতে রহমান সুরভী
আমার মা আমার চোখে দেখা অন্যতম সফল এবং অনুকরণীয় মানুষ। হয়তো সব সন্তানদের কাছেই তার মা পৃথিবীর সেরা মা, আমার বেলায় তিনি সেরা মা শুধু নন, জীবনের সফল নায়ক, সার্থক স্ত্রী, সার্থক কর্মজীবন। ১৯৬৬ তে এস.এস.সি, ১৯৬৮তে এইচ.এস.সি, ১৯৭0-এ ডিগ্রী পাস, ১৯৮১ তে বি.এড। তার জীবনে অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা আর প্রশিক্ষণ রয়েছে। হয়েছেন উপজেলার শ্রেষ্ঠ শ্রেনি শিক্ষক, পেয়েছেন রোকেয়া পদক, শ্রেষ্ঠ জয়িতা আরও অসংখ্য পুরস্কার। তিনি ছিলেন তাঁর স্কুলের প্রথম ছাত্রী। অনেক ঘাত প্রতিঘাত পার হয়েছেন।
কখনও আমরা তাকে আমাদের জন্য ফ্যাছফ্যাছ কান্না করতে দেখিনি। একটা উদাহরণ দেই। আমি হলে থাকতে আম্মাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম ”আম্মা, সবার মায়েরা তার মেয়ে কি খেয়েছে জিজ্ঞেস করে তুমি তো কখনও করোনা”।৷ আম্মা উত্তর দিলেন, “হলের খাবার কারো কাছেই ভালো লাগে না, জিজ্ঞেস করলে আমারও মন খারাপ হবে তোমার ও। আমিও হলে থেকেছি তাই কস্ট পেওনা। মানুষ হবার জন্য এটুকু করতে হবে।” উল্লেখ্য আম্মা বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে যে হোস্টেলে ছিলেন আমিও সেই হোস্টেলে এইচ.এস.সি তে থেকেছি ৩৬ বছর পর।
তার স্মার্টনেসের একটা উদাহরণ দেই। আমি যখন থার্ড ইয়ার এ, তখন ডিপার্টমেন্ট থেকে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, রাংগামাটি ট্যুরে যাব। আম্মাকে জানালাম, আমার বান্ধবীদের মা বাবা অনেকেই আপত্তি করেছে তুমি তো করলে না একবার ও। জবাবে বললে, “স্টুডেন্ট লাইফে আমরাও অনেক শিক্ষা সফরে গিয়েছি। না ঘুরলে মনটা বড় হয় না। নিষেধ করার প্রশ্নই আসেনা ”
এটা হল মুদ্রার এপিঠ। ওপিঠ আরও বৈচিত্রময়।
সকালে ফজরের নামাজ পড়তে মুখ দিয়ে ডাকেন নি, ঝারু সমেত দাড়িয়ে থাকতেন। নামাজ না পরলে সে বেলার ভাত বন্ধ।
আরও কত গল্প আছে!!!!
জীবনে খাওয়া নিয়ে জেদ করিনি, না খেয়ে থাকিনি। কারণ??? বলছি।
আমি ইলিশ মাছ ভাজা না হলে খেতাম না ছোটবেলায়। একদিন আমার জন্য ভাজা মাছ নেই। রাগ করে খেলাম না, আম্মাও আমাকে রান্না মাছ দিলেন না। ব্যাস, আম ও গেলো বস্তা ও গেলো। এরপর আর জিদ চলে একদম সোজা হয়ে গেলাম।
ক্লাস ফাইভে থাকতে বৃত্তি কোচিং করতে খুব সকালে যেতাম। কি নিয়ে রাগ করেছিলাম মনে নেই। না খেয়েই স্কুলে যেতে থাকলাম। আস্তে আস্তে হাটছি ভাবলাম আম্মা পিছন থেকে ডাকবে। আম্মাও ডাকলোনা, আমার ফিরে আসাও হলো না, না খেয়ে সারাদিন। ব্যস জন্মের মত না খেয়ে থাকার মজা বুঝলাম।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তিনি কেন হবেন না? উদাহরণ দেই।
আমি যখন ৮/৯ ক্লাসে পরি তখন আম্মা ছিলেন আমার ক্লাস টিচার, আমি ছিলাম ক্যাপ্টেন । ক্লাসের ঘন্টা পড়ার পরও কয়েকজন বাইরে ছিল। সাথে সাথে তিনি সোজা ক্লাসে এসে আমাকে মারতে শুরু করলেন যদিও আমি বাইরে ছিলাম না। শাস্তির কারণ ক্লাস ক্যাপ্টেন হয়ে যে ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার তো এতটুকু শাস্তি পেতেই হবে।
এরকম অন্তত আরও ১০০ টা ঘটনা আছে কটা বলবো?
এবারের গল্পটা শেষ।
ক্লাস এইটের বৃত্তি পরিক্ষার প্রস্তুতি চলছে,
ডিসেম্বর মাস। ১২ টায় ঘুমাতে গেলাম। আম্মা লেপ সরিয়ে দিয়ে বসিয়ে রাখলেন। বললেন, মিটসেল্ফে নুডুলস রান্না আছে, পড়বি আর খাবি আমি ঘুমালাম, তোর আব্বা জেগে থাকবে। আমার এইটের স্কলারশিপ আম্মার জন্যই এসেছিল। আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না।
এখন ভাবি, বাকি জীবনের পরিক্ষা যদি আম্মার কাছে থেকে দিতে পারতাম!!!
এখন ও আম্মাকে দেখে অবাক হই। পুরো রমজানে রোজা রেখেছেন ৭১ বছর বয়সেও। ২১ বছর ধরে ডায়াবেটিস। রমজানের একটি ও বেজোড় রাতে ঘুমান ণি। সামনে অস্ট্রেলিয়া যাবার প্ল্যান করছে, পুতি হবে তাই নাত্নির কষ্টের সময় যদি একটু সাহায্য হয়।।
তিনি আমার মা। ভাবছি, আম্মাকে নিয়ে একটি বই লিখবো। বায়োগ্রাফি।
আম্মা অনন্যা কারণ আমার বাবা হচ্ছেন তার জীবনসাথী।
তাদের জন্য দোয়া চাই।
আল্লাহ আম্মাকে নেক হায়াত দান করুন।
রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সাগিরা।
আমিরুন্নেছা বিনতে রহমান সুরভী
প্রভাষক, নারায়ণকুল ড্রিম মডেল স্কুল এন্ড কলেজ
















